আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশের অভিজাত এলাকায় কর ফাঁকি রোধে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অভিজাত আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, অফিস স্পেস, বিলাসবহুল গাড়ি এবং উচ্চমূল্যের সম্পদের মালিকদের শনাক্ত করতে ডোর-টু-ডোর জরিপ চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব এলাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শপিংমল, নামিদামি রেস্টুরেন্ট ও শোরুমগুলোর ভ্যাট পরিশোধ কার্যক্রমও কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন অর্থবছরের বাজেটে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে পারে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে—দেশের অভিজাত শ্রেণির বড় একটি অংশ প্রকৃত আয় গোপন করে কর ফাঁকি দিয়ে আসছে। অনেকেই কোটি কোটি টাকার বাড়ি, ফ্ল্যাট কিংবা বাণিজ্যিক স্পেসের মালিক হলেও নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেন না। আবার কেউ কেউ রিটার্ন দিলেও প্রকৃত সম্পদের মূল্য, ভাড়া আয় কিংবা বিনিয়োগের তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করেন না। বিশেষ করে রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানমন্ডি, উত্তরা, বসুন্ধরা, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর ও ওয়ারীর মতো এলাকায় বিপুল সংখ্যক সম্পদশালী ব্যক্তি আয়কর নথিতে প্রকৃত তথ্য গোপন করছেন বলে ধারণা করছে কর প্রশাসন।
শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রামের খুলশীসহ বিভাগীয় শহরগুলোর অভিজাত এলাকাতেও একই ধরনের জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এনবিআরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, উচ্চবিত্ত শ্রেণির একটি অংশকে সঠিকভাবে করজালের আওতায় আনা গেলে সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে সাধারণ করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপও কমানো সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন করদাতা সৃষ্টির অংশ হিসেবেই এই জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতদিন এনবিআরকে নিয়ে একটি বড় সমালোচনা ছিল—যারা নিয়মিত কর দেয়, মূলত তাদের ওপরই করের বোঝা বাড়ানো হয়; অথচ বিপুল সম্পদের মালিক অনেকেই করের বাইরে থেকে যান। আগামী অর্থবছর থেকে সেই চিত্র বদলাতে চায় রাজস্ব প্রশাসন। এজন্য মাঠপর্যায়ে ব্যাপক তথ্য সংগ্রহ, কর নথি যাচাই এবং সম্পদ অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হবে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি বাজেট প্রস্তাবনা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে এনবিআর কর্মকর্তারা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনা পেয়েছেন। বৈঠকে বিনাপ্রশ্নে কালো টাকা বৈধ করার বিষয়টিও আলোচনা হয়। তবে একই সঙ্গে অভিজাত এলাকায় বসবাসকারী সম্পদশালী ব্যক্তিদের কর নথি যাচাই, সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং করের আওতায় আনার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী বাজেটে ডোর-টু-ডোর জরিপ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশে বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত সম্পদ রয়েছে। অনেকেই কোটি কোটি টাকার ফ্ল্যাট বা জমি কিনলেও তা আয়কর রিটার্নে দেখান না। কেউ কেউ আবার সম্পদের মূল্য কম দেখিয়ে কর কম দেন। এছাড়া রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট ও অফিস স্পেস থেকে মাসে লাখ লাখ টাকা ভাড়া আয় হলেও প্রকৃত আয় গোপন করা হয়। এই পরিস্থিতি বন্ধ করতে সম্পদ যাচাই ও আয় অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
কর প্রশাসনের ধারণা, সঠিকভাবে জরিপ পরিচালনা করা গেলে হাজার হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব। এজন্য সম্পদভিত্তিক কর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, আগামী বছর সম্পদ কর আদায়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সীমার ওপরে সম্পদের ওপর ১ শতাংশ হারে সম্পদ কর আরোপ করা হলে বছরে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আসতে পারে।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে জমির মৌজামূল্য বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জমির সরকারি মূল্য বাস্তব বাজারদরের তুলনায় অনেক কম থাকায় কর ফাঁকির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন জমির মূল্যায়ন আধুনিক ও বাজারভিত্তিক করার বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, কেবল প্রগ্রেসিভ কর ব্যবস্থার মাধ্যমেই কর কাঠামোয় ন্যায্যতা আনা সম্ভব। অর্থাৎ যার আয় ও সম্পদ বেশি, তাকে তুলনামূলক বেশি কর দিতে হবে। একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর যেন অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেটিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। কর সংস্কারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীকে কঠোর নজরদারির আওতায় এনে কর ন্যায্যতা নিশ্চিত করা।
এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও কর সংস্কার এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও কর ব্যবস্থার বৈষম্য দূর করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ গোষ্ঠী কর সুবিধার বাইরে থেকেছে এবং কর কাঠামো সীমিত পরিসরে পরিচালিত হয়েছে। উচ্চ আয়ের ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও সম্পত্তির মালিকদের করজালে আনতে ডিজিটাল ব্যবস্থা, তথ্য বিনিময় ও ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক সম্পত্তি কর ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
বাজেটসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজধানীর গুলশান ও বনানীর মতো এলাকায় মাঝারি আকারের একটি ফ্ল্যাটের দাম বর্তমানে ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার বেশি। বাণিজ্যিক অফিস স্পেসের দাম আরও বেশি। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের তুলনায়ও এসব এলাকার সম্পদের মূল্য কয়েকগুণ বেশি। অথচ এসব লেনদেনের বড় অংশ পুরোপুরি নজরদারির আওতায় আসে না। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। এ অবস্থায় ফ্ল্যাট, জমি, বাণিজ্যিক স্পেস ও বিলাসবহুল গাড়ির ক্রয়-বিক্রয় কঠোরভাবে মনিটরিং করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে অপ্রদর্শিত সম্পদ কীভাবে বৈধতার আওতায় আনা যায়, তা নিয়েও কাজ চলছে। যদিও নতুন সরকারের প্রথম বাজেটেই প্রকাশ্যে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে বিতর্ক তৈরি করতে চায় না নীতিনির্ধারকরা। তবে বিকল্প কোনো কাঠামোর মাধ্যমে এই সুযোগ দেওয়া যায় কিনা, সে বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। এ লক্ষ্যে ভূমি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠকেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে ভ্যাট আদায় বাড়াতে বড় বড় শপিংমল, ব্র্যান্ড শোরুম ও রেস্টুরেন্টে নজরদারি বাড়ানো হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের ভ্যাট কমিশনারেটকে ইতোমধ্যে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাজেট ঘোষণার পর মাঠপর্যায়ে বিশেষ অভিযান ও প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম জোরদার করা হতে পারে।
এছাড়া আগামী বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন শিল্প খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ভিন্ন কাঠামোয় কর অবকাশ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব সুবিধার সঙ্গে “সানসেট ক্লজ” যুক্ত থাকবে, অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের পর সেই খাত আর কর অবকাশ সুবিধা পাবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কৃষিযন্ত্রপাতি, অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিকস উপাদান, ফার্মাসিউটিক্যালস, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং, কম্পিউটার হার্ডওয়্যার, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, চামড়াজাত পণ্য, টেক্সটাইল যন্ত্রপাতি, টায়ার উৎপাদন, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশসহ বেশ কিছু শিল্পখাতে নতুন বিনিয়োগে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর ছাড় দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবোটিক্স ও ন্যানোটেকনোলজি ভিত্তিক শিল্পও এই সুবিধার আওতায় আসতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি কর প্রশাসন সত্যিকার অর্থে উচ্চ আয়ের করফাঁকিবাজদের শনাক্ত করতে পারে এবং সম্পদভিত্তিক কর ব্যবস্থা কার্যকর করতে সক্ষম হয়, তাহলে দেশের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে কর ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বৈষম্যও কিছুটা কমবে। তবে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রযুক্তিনির্ভর তথ্যভাণ্ডার এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


