৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যকে সামনে রেখে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তুত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ হিসেবে চলতি অর্থবছরের তুলনায় বাজেটের আকার ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বাড়ছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রণীত এ বাজেটে দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাজেটকে বাস্তবসম্মত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নযোগ্য করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
গত শুক্রবার সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রাবিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভায় নতুন বাজেটের আকার ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অনলাইনে অনুষ্ঠিত ওই সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন। সেখানে চলতি অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং ২০২৬–২৭ থেকে ২০২৮–২৯ অর্থবছর পর্যন্ত মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রক্ষেপণ নিয়ে আলোচনা হয়। এ পর্যন্ত দেশে মোট ৫৪টি জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে, আর সেই ধারাবাহিকতায় সদ্য রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করা বিএনপি সরকার এবার দেশের ৫৫তম বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে।
আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তুত করা বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধন করে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজস্ব আয়ের এই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার পেছনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় অতীতে এনবিআর নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় এবার কঠোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়কে মোট দেশজ উৎপাদনের ৯ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে, যা পূরণের জন্যই এই উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগ ও এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বিগত সময়ে এনবিআর প্রায় কখনই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। এমনকি চলতি অর্থবছরে সংশোধিত লক্ষ্য ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত ৪ লাখ কোটি টাকা আদায় নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির তুলনায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত এডিপির তুলনায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধন করে ২ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে।
আগামী অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা দেশীয় উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। আয় ও ব্যয়ের এই কাঠামোর ভিত্তিতে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৯ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ধরা হতে পারে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের আকার নির্ধারণ করা হতে পারে ৬৮ লাখ ৩১৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের আকার নির্ধারণ করা হয় ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা, যা সংশোধন করে ৬১ লাখ ২১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাজেটের বর্তমান আকার কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক সরকার চাইলে এতে পরিবর্তন বা পরিমার্জন আনা হতে পারে। সদ্য দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকার পরিস্থিতি বিবেচনায় বাজেট কাঠামোয় সংশোধন আনতে পারে। আপাতত বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বরাদ্দ নির্ধারণ করা হবে। অর্থ বিভাগ আগামী বাজেটে বরাদ্দ নির্ধারণে দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারী ও শিশু উন্নয়ন এবং জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দিতে নির্দেশনা দিয়েছে। পাশাপাশি এমন কার্যক্রমে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা সরকারের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে সরাসরি সহায়ক।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্নীতি, অপচয় ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে দেশের স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন এখনও অর্জিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও সেবার মান নিম্নমুখী অবস্থায় রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের দিক থেকেও পিছিয়ে আছে। অন্যদিকে শিক্ষা খাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মোট দেশজ উৎপাদনের ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন হলেও দেশে তা ২ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে, ফলে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে সাম্প্রতিক সময়ে নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যবসায়ী মহলের মতে, বিনিয়োগ পরিবেশে অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—উভয় ধরনের বিনিয়োগেই ধীরগতি দেখা দিচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, আবার অনেক সম্ভাবনাময় শিল্প অর্থাভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, সুদের হার বৃদ্ধি এবং অর্থায়ন সংকট ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, দেশে দুর্নীতি কমেনি এবং দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগে স্থবিরতা রয়েছে। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ এক শতাংশের নিচে নেমে প্রায় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।


