আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাজেট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এই খরচ বাড়ার প্রধান কারণ বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলা, ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় বৃদ্ধি, সুদের পরিশোধ বাড়া এবং সরকারি কর্মচারীর প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ আংশিক বাস্তবায়ন।
এ সিদ্ধান্তগুলো গত শুক্রবার রাতে অনলাইনে অনুষ্ঠিত সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও বিনিময় হার-সংক্রান্ত কোঅর্ডিনেশন কাউন্সিল এবং বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় বৈঠকে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় সাত হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। যা পরে সংশোধিত হয়ে সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় নামানো হয়। উন্নয়ন খরচ কমিয়ে ভর্তুকি ও অনুন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হয়েছিল।
এ হিসাবে চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী বাজেট প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়ছে। অতীতে প্রতিবছর সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাজেট বাড়ানো হতো। গত অর্থবছর এর ব্যতিক্রম ছিল।
গতকাল অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত অর্থ বিভাগের এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অর্থমন্ত্রী, অর্থ সচিব ও ইআরডি সচিব আইএমএফের বৈঠকে যোগ দিতে ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কারণে বৈঠকটি দ্রুত শেষ করা হয়। তারা ফিরে এসে বাজেট প্রণয়ন নিয়ে আবার আলোচনা করবেন।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাথমিক বাজেটের আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি বা অবনতির ওপর ভিত্তি করে এই সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতসহ বৈশ্বিক পরিস্থিতি এতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা উল্লেখ করেন। তারা জানান, সরকার আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
‘উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সীমাবদ্ধতা’
গত শুক্রবার সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং বহুমাত্রিক চাপ মোকাবিলার মধ্য দিয়ে আমরা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করেছি। তিনি আরও বলেন, নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট ঘিরে জনগণের ব্যাপক প্রত্যাশা রয়েছে। একই সঙ্গে আমরা আশা করি, অতীত থেকে পাওয়া নানা সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও জনগণ বিবেচনায় নেবেন। তাঁর মতে, সরকারের লক্ষ্য শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, বরং একটি টেকসই, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা।
রাজস্ব ও ঘাটতি
আগামী অর্থবছরে প্রায় ছয় লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় দুই লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে রাখা হবে।
এই ঘাটতির মধ্যে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ ঋণের মাধ্যমে এবং বাকি এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ থেকে সংগ্রহ করা হবে। এর একটি বড় অংশ বাজেট সহায়তা হিসেবে পাওয়ার আশা করছে সরকার।
রাজস্ব বাড়াতে ভ্যাট অব্যাহতি কমানো এবং রাজস্ব আদায় কার্যক্রম ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো এবং বন্ধ কারখানাগুলো পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
ব্যয়ের কাঠামো
আগামী বাজেটের প্রায় ৬৭ শতাংশ পরিচালন খাতে এবং ৩৩ শতাংশ উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হবে। যদিও নতুন উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হবে, তবে আপাতত সেগুলোতে বড় ব্যয়ের পরিকল্পনা নেই বলে জানা গেছে।
ভর্তুকি বাড়বে
আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি– বিশেষ করে ইরান সংকটের কারণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, কৃষি ও সারের ভর্তুকি বাড়বে আগামী অর্থবছরে।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ফলে চলতি অর্থবছরের মার্চ-জুন সময়কালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও এলএনজিতে বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন
সরকার আগামী অর্থবছরে ৫০ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় আনতে চায়। এ ছাড়া প্রকৃত কৃষক, জেলে ও পশুপালনের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়া হবে।
‘নতুন কুঁড়ি’ ক্রীড়া কর্মসূচির আওতায় ১২-১৪ বছর বয়সী মেধাবী ক্রীড়াবিদদের বৃত্তি দেওয়া হবে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে। এসব খাতে আগামী অর্থবছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এসব কারণে দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে থাকা অর্থনীতি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে আরও সংকটে পড়লেও ব্যয় কমানোর সুযোগ খুব সীমিত। ফলে সরকার বাড়তি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে। তবে বড় বাজেটের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগও অব্যাহত থাকবে।
সামগ্রিকভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজেটের আকার ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা উচ্চাভিলাষী হলেও নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তা নির্ধারণ করা হচ্ছে।


