কনটেইনার ডিপো মাশুল ২০% বৃদ্ধিতে সমঝোতা: কাটল অনিশ্চয়তা

অর্থনীতি স্লাইড

 

দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রাম বন্দরে বেসরকারি কনটেইনার ডিপো বা অফডকগুলোর মাশুল বৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও টানাপোড়েনের অবসান ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের উপস্থিতিতে দীর্ঘ আলোচনার পর বিদ্যমান মাশুলের ওপর সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বৃদ্ধির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় যে অচলাবস্থা ও পণ্য জট সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, তার মেঘ কেটেছে।

গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) সম্মেলন কক্ষে এক উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মনিরুজ্জামান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন এবং স্টেকহোল্ডারদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা), বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফা), বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএএ) এবং বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) নেতৃবৃন্দ।

এছাড়া রপ্তানি খাতের বৃহৎ দুই সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রতিনিধিরাও এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেন। দীর্ঘ যুক্তিতর্ক ও আলোচনার পর বন্দর চেয়ারম্যান মাশুল সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বৃদ্ধির অনুমোদন দেন। বাফার সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন জানান, সভার কার্যবিবরণীতে (মিনিটস) সব পক্ষ স্বাক্ষর করার দিন থেকেই এই নতুন হার কার্যকর হবে।

এই সমঝোতাকে বেসরকারি ডিপো মালিকদের নমনীয় হওয়ার একটি বড় দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। উল্লেখ্য যে, শুরুতে ডিপো মালিকরা তাদের পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে মাশুল একলাফে ৬০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি তুলেছিলেন। পরবর্তীতে তারা সেপ্টেম্বর মাস থেকে ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধির ঘোষণা দিলেও আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে তা আটকে যায়।

ডিপো মালিকরা তাদের দাবিতে অনড় থেকে গত ১১ ডিসেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দিলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হলে ১০ ডিসেম্বর বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যস্থতায় ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। অবশেষে গত মঙ্গলবারের এই চুক্তির মাধ্যমে একটি মধ্যস্থতা ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান নিশ্চিত হলো।

মাশুল নির্ধারণ নিয়ে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোনো জটিলতা তৈরি না হয়, সেজন্য সভায় একটি সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে মাশুল যৌক্তিকীকরণের (Tariff Rationalization) লক্ষ্যে একটি বিস্তারিত সমীক্ষা পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য একজন আন্তর্জাতিক অথবা স্থানীয় পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে।

পরামর্শকের দেওয়া তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতে মাশুল নির্ধারণের একটি স্থায়ী ও স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করা হবে। এর ফলে মাশুল নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্থায়িত্ব আসবে এবং স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক জানিয়েছেন, সভার কার্যবিবরণী চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে এটি প্রস্তুত হয়ে যাবে এবং সকল পক্ষের স্বাক্ষরের পর আনুষ্ঠানিকভাবে ২০ শতাংশ বর্ধিত মাশুল কার্যকর হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সমঝোতা শুধু বর্তমান সংকটই দূর করেনি, বরং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের গতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাররা এখন নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সংশোধিত মাশুলের চূড়ান্ত কাঠামোটি দ্রুত নির্ধারণ করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *