প্রায় ৪২ বছর আগের ঘটনা। চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাট এলাকায় প্যাসিফিক জিনস গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত নাসির উদ্দিন তাঁর দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন জিনস তৈরির কারখানা ‘এনজেডএন ফ্যাশন’। সেই কারখানা থেকেই ১৯৮৪ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে জিনস রপ্তানি শুরু হয়। ইতালির ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান ‘কারেরা’র জন্য ১২ হাজার ডলারের জিনস পোশাক রপ্তানি করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। জিনস রপ্তানির সেই সূচনা থেকে চার দশক পেরিয়ে এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডেনিম পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষ অবস্থান দখল করেছে বাংলাদেশ। কয়েক বছর আগেই এ অর্জনের স্বীকৃতি পেয়েছে দেশটি, আর প্রতিবছরই ডেনিম রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা) ও ইউরোস্ট্যাটের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে গত বছর ২৬০ কোটি মার্কিন ডলারের ডেনিম পোশাক ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি হয়েছে। ২০২৪ সালে রপ্তানি হয়েছিল ২০৭ কোটি ডলারের ডেনিম পোশাক। অর্থাৎ বড় দুই বাজারে বাংলাদেশের ডেনিম পোশাকের রপ্তানি গত বছর প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মতে, গত দেড় দশকে দেশে ডেনিম কাপড় উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হয়েছে। একই সঙ্গে ডেনিম পোশাক তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল—গ্যাস ও পানি—দেশে তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যায়। ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে চীন থেকে ডেনিম পোশাকের কিছু ক্রয়াদেশ অন্যত্র সরছে, যার একটি অংশ বাংলাদেশে আসছে। এ ছাড়া গত এক দশক ধরে ঢাকায় আন্তর্জাতিক ডেনিম এক্সপো আয়োজন করা হচ্ছে, যা বিদেশি ক্রেতা ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এতদিন এই খাতে টি-শার্ট, ট্রাউজার, সোয়েটার, শার্ট, ব্লাউজ ও অন্তর্বাসের মতো তুলনামূলক কম দামের পণ্যের প্রাধান্য ছিল। তবে দেরিতে হলেও ডেনিমের মতো ভ্যালু অ্যাডেড বা উচ্চমূল্যের পোশাক এখন শীর্ষ রপ্তানি পণ্যের তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে।
এ নিয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘আমরা অনেক দিন ধরেই ভ্যালু অ্যাডেড বা বেশি দামের পোশাক রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছি। ডেনিম পোশাকের রপ্তানি বৃদ্ধি সেই চেষ্টারই অংশ।’ তিনি আরও বলেন, বিশ্বজুড়ে ডেনিমের চাহিদা সারা বছরই থাকে। দেশে ডেনিম কাপড় উৎপাদনের নতুন নতুন কারখানার পাশাপাশি আধুনিক ওয়াশিং প্ল্যান্ট হচ্ছে। ফলে ডেনিম পোশাকের রপ্তানি প্রতিবছরই বাড়ছে।
দুই বাজারেই বাংলাদেশ সেরা
বাংলাদেশ গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৯৬ কোটি ডলারের ডেনিম পোশাক রপ্তানি করেছে, যা এর আগের বছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি। এ ক্ষেত্রে প্রায় ২৬ শতাংশ হিস্যা নিয়ে ডেনিম পোশাক শীর্ষে রয়েছে। অটেক্সার তথ্যানুযায়ী, মেক্সিকো দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ডেনিম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। তারা গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৬৪ কোটি ডলারের ডেনিম পোশাক রপ্তানি করেছে। এ ছাড়া ভিয়েতনাম ও পাকিস্তান ৫০ কোটি ডলার করে ডেনিম পোশাক রপ্তানি করেছে। ভিয়েতনামের রপ্তানি ২৬ শতাংশ ও পাকিস্তানের রপ্তানি সাড়ে ১৬ শতাংশ বেড়েছে। এ ছাড়া কম্বোডিয়া গত বছর রপ্তানি করে ২৫ কোটি ডলারের ডেনিম পোশাক। তাদের প্রবৃদ্ধি হয় ২২ শতাংশ।
অন্যদিকে ইউরোস্ট্যটের তথ্যানুযায়ী, ইইউভুক্ত দেশগুলোতে গত বছর বাংলাদেশ ১৬৪ কোটি ডলারের ডেনিম পোশাক রপ্তানি করেছে, যা তার আগের বছরের তুলনায় ২১ শতাংশ বেশি। ইইউতেও বাংলাদেশ শীর্ষ ডেনিম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। দ্বিতীয় পাকিস্তান। গত বছর পাকিস্তান ১০৩ কোটি ডলারের ডেনিম পোশাক রপ্তানি করেছে, প্রবৃদ্ধি ২৩ শতাংশ। এ ছাড়া ইইউর বাজারে গত বছর ৯৮ কোটি ডলারের ডেনিম পোশাক রপ্তানি করেছে তুরস্ক। তাদের প্রবৃদ্ধি দশমিক ৪৮ শতাংশ। গত বছর তিউনিসিয়া ৪০ কোটি ও চীন ২৯ কোটি ডলারের ডেনিম পোশাক রপ্তানি করে যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিউনিসিয়ার ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ ও চীনের সাড়ে ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
দেশের রপ্তানিকারকেরা জানান, আরামদায়ক, স্থায়িত্ব, সাশ্রয়ী মূল্য ও ক্যাজুয়াল ফ্যাশনের প্রতি মানুষের আগ্রহের কারণে ডেনিমের চাহিদা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালে ডেনিম পোশাক আমদানি হয়েছিল প্রায় ৩৩৮ ডলারের, যা গত বছর বেড়ে হয়েছে ৩৬৮ কোটি ডলার। অন্যদিকে ২০২৪ সালে ইইউর দেশগুলো ৪৭২ কোটি ডলারের ডেনিম পোশাক আমদানি করে। গত বছর সেটি বেড়ে হয় ৫৫০ কোটি ডলার।
এক দশকে অবস্থান সুসংহত
এক দশক আগেও দেশে ডেনিম কাপড় উৎপাদনের মিলের সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ থেকে ১২টি, যা এখন বেড়ে প্রায় ৫০টির কাছাকাছি পৌঁছেছে। উদ্যোক্তাদের মতে, বর্তমানে দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ ডেনিম কাপড় স্থানীয় মিলগুলোই সরবরাহ করছে। বাকি ৪০ শতাংশ চাহিদা পূরণে তুরস্ক, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে। ডেনিম পোশাক খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে ২০১৪ সাল থেকে ঢাকায় ‘বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপো’ নামে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে। পোশাকশিল্পের সফল উদ্যোক্তা মোস্তাফিজ উদ্দিনের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ (বিএই) এই আয়োজন করে আসছে। এ প্রদর্শনীতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের খ্যাতনামা ডেনিম মিল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম ও রাসায়নিক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো অংশগ্রহণ করে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রতিনিধিরাও এতে যোগ দেন।
ঢাকা ও চট্টগ্রামে শিন শিন গ্রুপের পাঁচটি কারখানার মধ্যে চারটিতে ডেনিম পোশাক তৈরি হয়। গত অর্থবছরে গ্রুপটি ৫ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে অধিকাংশই ডেনিম পোশাক। জানতে চাইলে শিন শিন গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদাত হোসেন বলেন, ‘ডেনিম এক্সপো আমাদের মার্কেটিংয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। ক্রেতারা আমাদের সক্ষমতা সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়েছে, যা কিনা আমাদের ডেনিম পোশাকের বাজার ধরতে ব্যাপক সহায়তা করেছে।’


