ভ্যাট সংস্কারে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

ভ্যাট সংস্কারে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্লাইড

 

দেশের কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। বিশেষ করে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে করজাল সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরিকল্পনা সামনে এসেছে। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, এটি একদিকে যেমন রাজস্ব বাড়াতে সহায়ক হতে পারে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের দরিদ্রতম ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর বাইরে থাকা প্রায় সব পণ্য ও সেবার ভ্যাট অব্যাহতি ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করা হতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে এই ৪০ শতাংশ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ। অর্থ মন্ত্রণালয়ে গত ৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং সেখানে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রাজস্ব বৃদ্ধির বিভিন্ন কৌশল নিয়ে মতবিনিময় হয়।

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিম্ন-আয়ের জনগোষ্ঠীর বাইরে থাকা নাগরিকদের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সেবা, আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিকস, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার সামগ্রী, ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবায় বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতি বাতিল করা হতে পারে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য যেমন চাল-ডাল, কৃষিপণ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মৌলিক সেবাকে আপাতত এই পরিবর্তনের বাইরে রাখার চিন্তা রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকেও কর অব্যাহতি কমিয়ে আনার বিষয়ে বাংলাদেশকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভ্যাট ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে তারা।

এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং কোন কোন খাতে পরিবর্তন আসবে তা চূড়ান্ত হয়নি। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী অর্থবছর থেকে ধাপে ধাপে এই সংস্কার বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি একবারে নয়, বরং ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হবে যাতে বাজারে বড় ধরনের চাপ না পড়ে।

এছাড়া ভ্যাট ব্যবস্থায় আরও কিছু নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথাও আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভ্যাট রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক করা, অনলাইনে কর ও ভ্যাট রিটার্ন দাখিল সম্পূর্ণভাবে বাধ্যতামূলক করা এবং করদাতাদের জন্য ইউনিক ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর চালু করা। এতে টিআইএন ও বিআইএন একীভূত করার সম্ভাবনাও রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস ভ্যাট। মোট রাজস্বের প্রায় ৩৮ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এককভাবে ভ্যাট থেকে প্রায় ১.৪১ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। তবে একই সঙ্গে ভ্যাট অব্যাহতির কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় কয়েকশো পণ্য ও সেবা সম্পূর্ণ বা আংশিক ভ্যাট অব্যাহতির আওতায় রয়েছে। এর মধ্যে খাদ্য, কৃষি, পরিবহন, আর্থিক সেবা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া রপ্তানি খাত ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতেও বিশেষ ভ্যাট সুবিধা দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দরিদ্র ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে আলাদা করে ভ্যাট সুবিধা দেওয়া বাস্তবে কঠিন হতে পারে। কারণ একই পণ্য বা সেবা ধনী ও দরিদ্র উভয় শ্রেণিই ব্যবহার করে। ফলে এই সুবিধা সঠিকভাবে নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জিং হবে। তাদের মতে, ভ্যাট অব্যাহতি কমানোর চেয়ে ভ্যাট ফাঁকি রোধ ও প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো বেশি কার্যকর হতে পারে।

অন্যদিকে কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও টার্গেটিংয়ের মাধ্যমে এই সংস্কার সফল করা সম্ভব। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সরাসরি ভর্তুকি বা নগদ সহায়তার মাধ্যমে সুরক্ষা দেওয়া গেলে ভ্যাট অব্যাহতি কমালেও সামাজিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

বিশ্বব্যাপী ভ্যাট ব্যবস্থার উদাহরণ টেনে দেখা যায়, ১৭০টিরও বেশি দেশে ভ্যাট চালু রয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোতে এর হার বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি হলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় নির্দিষ্ট পণ্য ও সেবায় ছাড় দেওয়া হয়। তবে অনেক দেশেই এই সুবিধার কারণে উচ্চ আয়ের মানুষও পরোক্ষভাবে উপকৃত হয়, যা নীতিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশেও মৌলিক খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়। মূল উদ্দেশ্য থাকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ব্যয় কমানো। তবে এসব নীতির কার্যকারিতা নিয়ে সবসময়ই বিতর্ক থেকে যায়।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশে ভ্যাট অব্যাহতি সংস্কার একটি বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি সফল হলে রাজস্ব আয় বাড়ার পাশাপাশি কর ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপর সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *